হাকালুকির টর্নেডো মনে করিয়ে দিল সাটুরিয়ার ভয়াবহতা

প্রতি‌দিন বাংলা‌দেশ, ঢাকা: 
দেশের সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকি হাওরে হঠাৎ করে সৃষ্টি হওয়া ভয়ংকর জল টর্নেডোর ভিডিওটি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুঠোফোনে ধারণকৃত ওই ভিডিও নিয়ে আলোচনা এখন জেলাজুড়ে সবার মুখে মুখে। সাগরে এমন দৃশ্য দেখা গেলেও তা হাওর এলাকায় দেখা মিলে কম। নিকট অতীতে এমন দৃশ্যের দেখা মিলেছে কিনা তা নিয়ে যেমন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
গতকাল শনিবার (২৩ জুলাই) ঘটে যাওয়া হাকালুকি হাওরের টর্নেডো মনে করিয়ে দিল ৩২ বছর আগের ঘ‌টে যাওয়া মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার টর্নেডোর ভয়াবহতা কথা।

সাটু‌রিয়ায় ১৯৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল ওই দিন দেশের ইতিহাসে টর্নেডোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছিল।
হাকালুকি হাওরে হঠাৎ করে সৃষ্টি হওয়া ভয়ংকর জল টর্নেডোর ভিডিওটি ওই দৃশ্যের বিজ্ঞান সমেত বক্তব্যও খোঁজছেন অনেকেই। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিতে মূলধারার গণমাধ্যম কর্মীদেরকে ফোন দিয়ে তা জানতে চাচ্ছেন। তবে দীর্ঘদিন থেকে ভয়াবহ বন্যায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে থাকা হাকালুকি হাওর তীরের বাসিন্দারা বলেছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে এটা আল্লাহর কুদরত ও রহমত। টর্নেডোর পর ওই এলাকায় অনেক পানি কমেছে। জানা যায়, ২৩শে জুলাই শনিবার গোধুলীলগ্নে হঠাৎ করে হাকালুকি হাওরের চাতলাবিল ও বাইলাকান্দির মধ্যস্থলে জল টর্নেডো শুরু হয়। এমন দৃশ্য সরাসরি অবলোকন করেন ও নিজেদের মুঠোফোনে তা ধারণ করেন বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার হাওর পাড়ের মানুষ।
তারা বলেন, হঠাৎ হাওরের জল কুন্ডলির ন্যায় ঘূর্ণন গতিতে আকাশের দিকে উঠে কালো মেঘের ভেতর গিয়ে প্রবেশ করে।
এ অবস্থার স্থায়ীত্বকাল ছিল প্রায় ১৫ মিনিট। ওই  সময় হাওরের কয়েক কিলোমিটার এলাকা থেকে ওই স্থানে ছুটে যাওয়া পানির স্রোত ছিলো প্রবল। হাওর পাড়ের মানুষ প্রথমবারের মতো সরাসরি টর্নেডো প্রত্যক্ষ করেন ও অনেকেই মুঠোফোনে তা ভিডিও ধারণ করেন। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ওই ভিডিও ভাইরাল হয়। প্রথম দিকে অনেকে ওই ভিডিও নিয়ে নানা সন্দেহ পোষণ করলেও পরে তা প্রমাণিত হয় ওই ভিডিওটি হাকালুকির। হাওর তীরের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার সন্ধ্যার কিছু আগে হঠাৎ দেখেন হাওরের ভেতর পানি ও আকাশ এর মধ্যে হাতির শুঁড়ের মতো কিছু একটা ঘূর্ণন খাচ্ছে। অনেকেই এমন দৃশ্য দেখে ভয় পান। ঘূর্ণন দুর্বল হয়ে আসার পরই শুরু হয় ঝড় ও বৃষ্টি। ফেসবুকে লাইভকারী অনেকেই লিখেন বাতাশের টর্নেডো দেখেছি জলের টনের্ডো দেখলাম এই প্রথম। বেশ কয়েক বছর আগে হাকালুকি হাওরে এধরনের দৃশ্য দেখা গিয়েছিল বলে অনেকেই বলেছেন।
তবে এ টর্নেডোর কারণে কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে অনেকেই টর্নেডোর বিজ্ঞান সমেত বক্তব্য তুলে ধরেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তারা সংজ্ঞা দিচ্ছেন  টর্নেডো এক ধরনের ঝড়, যা বায়ুস্তম্ভের আকারে সৃষ্ট প্রচ- বেগে ঘূর্ণায়মান ঝড় যা মেঘ (সাধারণত কিউমুলোনিম্বাস, ক্ষেত্রবিশেষে কিউমুলাস) এবং পৃথিবীপৃষ্ঠের সাথে সংযুক্ত থাকে। টর্নেডোর আকৃতি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি দৃশ্যমান ঘনীভূত ফানেল আকৃতির হয়। যার চিকন অংশটি ভূপৃষ্ঠকে স্পর্শ করে এবং এটি প্রায়শই বর্জ্যের মেঘ দ্বারা ঘিরে থাকে। আবহাওয়া বিজ্ঞানের শব্দকোষ (এষড়ংংধৎু ড়ভ গবঃবড়ৎড়ষড়মু) অনুযায়ী, টর্নেডো হল প্রচ বেগে ঘূর্ণনরত একটি বায়ুস্তম্ভ, যা ভূপৃষ্ঠের সংস্পর্শে একটি কিউমুলিফর্ম মেঘ থেকে ঝুলন্ত বা এর নীচে থাকে, এবং প্রায়শই (কিন্তু সবসময় নয়) একটি ফানেলাকৃতির মেঘ হিসেবে দৃশ্যমান থাকে। টর্নেডো তৈরি হয় অনেকটা কালবৈশাখীর নিয়ম মেনে।
সমুদ্র থেকে গরম জলীয় বাষ্প ভরা বাতাস সমতলে ঢুকে ক্রমশ উপরের দিকে উঠতে থাকে। এক সময়ে তা ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে চলে আসে। আর তার থেকেই তৈরি হয় উল্লম্ব মেঘ। উল্লম্ব মেঘ উচ্চতায় বাড়তে থাকে এবং এক সময় সেই মেঘ ভেঙে গিয়ে তৈরি হয় কালবৈশাখী। টর্নেডো তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটাও প্রায় একই রকম। তবে এ ক্ষেত্রে বায়ুপ্রবাহের জটিলতায় দীর্ঘকায় উল্লম্ব মেঘের ভিতরে ঘূর্ণি তৈরি হয়। সেই ঘূর্ণি একটি সরু ফানেলের আকারে (মনে হয় যেন হাতির শুঁড়) নেমে আসে মাটির কাছাকাছি। আর মাটি ছুঁয়েই সেই দৈত্যাকৃতি ঘূর্ণায়মান ফানেল তার কেন্দ্রের দিকে সব কিছু টেনে নেয়।
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির জানায়, সাটু‌রিয়ায় ১৯৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল ওই দিনের টর্নেডো ম‌তো বড় এরপর আর তেমন ঘটনা ঘটেনি। তবে ছোটখাটো টর্নেডো ঘটে যাওয়া কোনো ব্যতিক্রম কিছু নয়।
আমাদের এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় টর্নেডো সাধারণত হয় না। এগুলো খুব বড় হয় না বলে আমাদের দেশের মানুষের নজরে তেমন আসে না।
তিনি বলেন, হাকালুকি হাওরে যেটা হয়েছে, সেটা কিছুটা বড় ছিল। হয়তো দিনের তাপমাত্রা সেখানে খুব বেশি ছিল। এ কারণে এটি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানেই হয়।
সূর্যের তাপে বাতাস খুব গরম হয়ে ওঠলে নিচের বাতাস হালকা হয়ে ওপরে ওঠে যায়। আর সেই শূন্যস্থানটা ওপরের বাতাস এসে পূরণ করে। গরমে সেটাও হালকা হয়ে ওপরে ওঠে যায়, ফের ওপর থেকে ঠাণ্ডা বাতাস নিচে নেমে এসে শূন্যস্থান পূরণ হয়। এতে যে ঘূর্ণনের সৃষ্টি হয়, সেটাই টর্নেডো।
তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, এবার জুলাই মাসে টানা তাপপ্রবাহ ছিল। এই মাসে সাধারণত বৃষ্টি থাকে। আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি খুব আগে থেকে ধারণা করা যায় না। বিশেষ টর্নেডোর হঠাৎ করেই হতে পারে। তবে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়া আপাতত হাকালুকির ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা কম। এ নিয়ে কোনো শঙ্কাও নেই। তবে তাপমাত্রা বেশি হলে ফের হতেই পারে।
তিনি বলেন, কয়েক দশক আগে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় একটা টর্নেডো হয়েছিল। সেটা অনেক বড় ছিল। এমন ঘটনা ঘটার এখন কোনো সম্ভাবনা নেই।
গতকাল শনিবার (২৩ জুলাই) সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে হঠাৎ করে হাকালুকি হাওরের চাতলাবিল ও বাইলাকান্দির মধ্যস্থলে জলস্তম্ভ বা জল টর্নেডো শুরু হয়। এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার হাওর পারের মানুষ।
হাওরের জল কুণ্ডলির মতো ঘূর্ণন গতিতে আকাশের দিকে উঠে কালো মেঘের ভেতর গিয়ে প্রবেশ করে। এ অবস্থার স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ১০ মিনিট। হাওরপাড়ের মানুষ প্রথমবারের মতো টর্নেডো প্রত্যক্ষ করে ও অনেকেই মোবাইল ফোনে তা ভিডিও ধারণ করে। যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সন্ধ্যার কিছু আগে হঠাৎ দেখেন হাওরের ভেতর পানি ও আকাশের মধ্যে হাতির শুঁড়ের মতো কিছু একটা ঘূর্ণি খাচ্ছে। ঘূর্ণন দুর্বল হয়ে আসার পরই শুরু হয় ঝড় ও বৃষ্টি। অনেকেই এমন দৃশ্য দেখে ভয় পায়।
১৯৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় আঘাত হেনেছিল টর্নেডো। এতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন প্রাণ হারিয়েছিল। আহত হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার জন। এতে ১ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছিল। ক্ষতি হয়েছে ২০ গ্রামের পরিবেশ-প্রতিবেশ।

১৯৮৯ সালে ২৬ শে এপ্রিল দিনেই সাটুরিয়ায় ঘটে যায় একটি প্রলয়ংকরী টর্নেডো। ৩২ বছর পেরিয়ে গেলেও দিনটি সাটুরিয়া উপজেলাবাসীর জন্য অত্যন্ত মরমান্তিক ও বেদনাদায়ক।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টর্নেডোর ঘটনা ঘটে মানিকগঞ্জ জেলায় সাটুরিয়া থানায় ১৯৮৯ সালের ২৬ শে এপ্রিল। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল বুধবার। ঠিক তার পরের দিন সাটুরিয়াতে সাপ্তাহিক হাটের দিন ছিল। এই হাটের দিনটি সাটুরিয়ার ব্যবসায়ীদের নিকট কেনাবেচা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। সাপ্তাহিক হাটের ঠিক আগের দিন অর্থাৎ ১৯৮৯ সালের ২৬ শে এপ্রিল সাটুরিয়াতে হয়ে যায় সর্বনাশা টর্নেডো। ট‌র্নে‌ডো‌তে সাটু‌রিয়ার অ‌নেক‌কে ক‌রে‌ছে নি:শ্ব আব‌ার বেশ ক‌য়েকজন হ‌য়ে‌ছে ধনবান।
সে সময় অবজারভার পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ধ্বংসযজ্ঞ এতই নিঁখুত যে, সেখানে কিছু গাছের কঙ্কাল ছাড়া দৃশ্যত দাঁড়ানো আর কোনো বস্তু নেই৷
এলাকায় লোকজ‌নের মু‌খে বল‌তে শোনা যায়, টর্নেডোর বেশ ক‌য়েক দিন আগে থে‌কে সাটু‌রিয়ায় বৃ‌ষ্টি হ‌চ্ছিল না। দীর্ঘ দিন ধ‌রে বৃ‌ষ্টি না হওয়ায় টর্নেডোর আগের দিন সাটু‌রিয়ায় বৃ‌ষ্টি প্রার্থণা ক‌রে উ‌ল্টো হাত ক‌রে মোনাজাত করা হয়।
২৬ এপ্রিল টর্নেডোর ওই দিন সকাল থেকেই সাটুরিয়ায় প্রচন্ড গরম অনুভূতি হচ্ছিল এবং কোন রকমের বাতাসের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। তখন ছিল রমজান মাস। রোজাদার মুসলমানরা সারা দিন রোজা থাকার পর সন্ধ্যার অা‌গে ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক এমন সময়ই আকাশটা কালো মেঘের ছায়ায় আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে আসছিল। মাগরিব ওয়াক্তের (সন্ধ্যার) পূর্ব মুহূর্তে আকস্মিকভাবে ঘূর্ণিবায়ুর উৎপত্তি হয়ে ধ্বংসাত্মক এক ভয়াবহ টর্নেডোর আকার ধারণ করে সাটুরিয়া উপজেলার ওপর আঘাত হানে। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৮০ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার।

এক মিনিটেরও কম সময়ের স্থায়ী হওয়া ওই টর্নেডোর আঘাতে এ উপজেলার ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকার সাটুরিয়া, হরগজ, তিল্লী, ফুকুরহাটি ইউনিয়নের প্রায় ২০ টির মতো গ্রামের সবকিছুই লণ্ড ভণ্ড হয়ে যায়। আর এতে প্রাণ হারায় প্রায় ১,৩০০ মানুষ এবং অঙ্গ হানী হয় প্রায় ২ হাজার লোক। প্রায় ১২ হাজার লোক আহত হয় এবং প্রায় এক লাখ লোক গৃহহীন হন। উপজেলার ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, সাটুরিয়া বাজারের ৪ শতাধিক দোকানপাট, উপজেলা সরকারি খাদ্যগুদাম, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাজার হাজার গাছপালা উপড়ে লণ্ডভণ্ড হয়।

বিশেষ করে টর্নেডোর আঘাতে প্রায় শত বছ‌রের প্রাচীন সাটুরিয়া বাজার সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ বিধ্বস্ত সাটুরিয়া উপজেলা পরিদর্শন করেছিলো। তারা বিধ্বস্ত সাটুরিয়ার উন্নয়ন করার জন্য নানারকম প্রতিশ্রুতিও দিয়ে যান। কিন্তু তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
অল্প সময়ের মধ্যে টর্নেডোতে এ ধরণের ভয়াবহ ধ্বংস লীলার কারনে ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ টর্নেডো গু‌লোর ম‌ধ্যে সাটুরিয়ার টর্নেডোকেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
২৯ টি বছর পার হলেও সাটুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এখন পর্যন্ত দেখা মিলে ১৯৮৯ সালের টর্নেডোর স্মৃতিচিহ্ন। সে সময় টর্নেডোর আঘাতে পঙ্গুত্ব বরন করে এখন পর্যন্ত বেঁচে আছে অনেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*