ভাতিজা ও নাতিকে মারধরের প্রতিবাদ করতে গিয়ে দাদার হার্ট স্টোকে মৃত্যু

মো: ওয়া‌সিম হো‌সেন:
ঢাকার ধামরাইয়ে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ নেতা রনি ও ছাত্রদলের কর্মী ইমরান, আসিফ এবং তার বাবার সাথে মারামারির ঘটনা ঘটে। এঘটনা শুনে ছাত্রদল কর্মী আসিফের দাদা জয়নুদ্দিন (৫৫) ঘটনা স্থলে এসে উত্তেজিত হইয়ে
স্টোক করে তার মৃত্যু হয়। এর আগেও তিনি স্টক করেছিলেন বলে জানান নিহতের স্বজনরা। এছাড়াও তার ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়েছিলো। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
শুক্রবার (১৮ নভেম্বর) সন্ধ্যার দিকে ধামরাই উপজেলার কুশুরা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহত জয়নুদ্দিনের ভাতিজা শুকুর আলীসহ তিন জন আহত হন।
নিহত জয়নুদ্দিন ধামরাই উপজেলার কুশুরা ইউনিয়নের স্বপন বেপারীর ছেলে। আহতরা হলেন- নিহত জয়নুদ্দিনের ভাতিজা শুকুর আলী(৩৮) ও শুকুর আলীর ছেলে ছাত্রদল কর্মী আসিফ (১৮) এবং ইমরান (১৯)।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সফল হওয়া নিয়ে ফাহিম আহমেদ ইমরান তার ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি- বিএনপি নামের ফেসবুক পেইজ এর একটি পোস্ট শেয়ার করেন ইমরান। যেখানে লেখা ছিলো, এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কই যাবি? টেইক ব্যাক বাংলাদেশ। বাংলাদেশ যাবে কোন পথে, ফয়সালা হবে রাজ পথে।
ফাহিম আহমেদ ইরানের ফেসবুকে এমন পোস্ট দেখে স্থানীয় আতিকুর রহমানের ছেলে ও ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রলীগের সহসভাপতি রনি হোসেন আসিফ ও ইমরান কে ডেকে এনে ধমকি-ধামকি দেন। পরে এই খবর শুনে আসিফের বাবা শুকুর আলী রনির সাথে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পরে। এর এক পর্যায়ে ছাত্রলীগ নেতা রনি, রনির সমর্থক ও শুকুর আলীর সাথে মারামারির ঘটনা ঘটে এবং শতাধিক মানুষের ভিড় জমে যায়। মারামারির খবর পেয়ে কুশুরা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সারোয়ার হোসেন বাবু মারামারি থামিয়ে ঘটনা স্থল থেকে নিয়ে শুকুর আলী ও আসিফ কে সেভ করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের ভিতরে নিয়ে বসতে বলেন।
পরে শুকুর আলীর চাচা জয়নুদ্দিন খবর পেয়ে পরিষদে এসে ইউপি সদস্য সারোয়ার হোসেন বাবুর সাথে উত্তেজিত হইয়ে জায়। এর এক পর্যায়ে জয়নুদ্দিন বুকে হাত দিয়ে নিচে পরে যায়। পরে উপস্থিত সবাই তার মাথায় পানি দিয়ে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ভুক্তভোগী আসিফ বলেন, আমি এবং আমার বন্ধু ইমরান কে ডেকে নেয় রনি। আমাদের ডেকে নিয়ে মারধর ও হুমকিধামকি দেয়। পরে আমার বাবা আসলে আমার বাবাকেও মারধর করে রনিসহ তার সমর্থকরা। এর পর আমার দাদা জয়নুদ্দিন এলে তাকে বকা বকি করে মেম্বার।
এবিষয়ে আহত শুকুর আলী বলেন, ছাত্রলীগের নেতা রনিসহ আরো কয়েক জন আমার ছেলে আসিফ ও তার বন্ধু ইমরান কে ডেকে নিয়ে হুমকি ধামকি দেয়। পরে আমি এর কারণ জানতে চাইলে রনি আমাকেসহ আমার ছেলেকে লাথি, কিল-ঘুষি দিয়ে মারধর করে। পরে এলাকার লোকজন আমাদের বাঁচায়। আমাকে মামার খবর শুনে আমার চাচা জয়নুদ্দিন এসে জিজ্ঞেস করে মেম্বারকে কেন মারলো। মেম্বার বাবু তখন আমার চাচার সাথে খারাপ ব্যবহার করে এবং উচ্চ স্বরে কথা বার্তা বলে। এর এক পর্যায়ে কাকা নিচে পড়ে যায়।
নিহত জয়নুদ্দিনের ভাতিজা মোঃ রতন আলী বলেন, মারামারি দেখে মেম্বার বাবু শুকুর আলী ও আসিফ কে সেভ করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের ভিতরে নিয়ে বসতে বলেন। যেন তাদের আর মারধর করতে না পারে কেউ। মারামারি শেষ হওয়ার ১০/১৫ মিনিট পর আমার চাচা জয়নুদ্দিন সেখানে আসে। এসে উত্তেজিত হইয়ে মেম্বার কে ধমক দিয়ে বলেন মেম্বার থাকতে আমার ভাতিজা, নাতিকে রনি মারে কিভাবে? মেম্বারও একটু উচ্চ স্বরে কথা বলে তার সাথে। কিন্তু মারামারির কোন ঘটনা ঘটেনি। পরে জয়নুদ্দিন বেশি উত্তেজিত হলে হঠাৎ বুকে হাত দিয়েই নিচে পড়ে যায়৷ পরে মেম্বারসহ আমরা তার মাথায় পানি দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেই। পরে জানতে পারি যে তিনি মারা গেছেন।
এবিষয়ে নিহত জয়নুদ্দিনের মেয়ে ইয়ার জান বলেন, আমার বাবা অসুস্থ ছিলেন। এর আগেও স্টক করেছিলেন তিনি। কয়েক বছর আগে আমার বাবার ওপেন হার্ট সার্জারী করা হয়েছিলো। আমার বাবার লাশ ময়না তদন্ত না করার জন্য ধামরাই থানায় লিখিত আবেদন করেছিলাম। কিন্তু আমাদের আবেদন শুনেন নি। এবিষয়ে আমাদের পরিবারের কারোরই কোন অভিযোগ নাই।
শুকুর আলীকে মারধরের বিষয়টি স্বীকার করে ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রনি হোসেন বলেন, ইমরান, আসিফ প্রধানমন্ত্রী কে কুটুক্তি করে ফেসবুকে পোস্ট করেছে। ওরা ছোট পোলাপান নিজেদের ছোট ভাই। তাই ডেকে এনে ওদের বোঝাইছি ওরা যেন এসব পোস্ট আর না করে। পরে আসিফের বাবা এসে আমার সাথে অযথা তর্ক করে। এক পর্যায়ে আমার উপরে হাত তুলে। আমিও পরে তাকে হিট করি। কিন্তু জয়নুদ্দিন মারামারির মধ্যে ছিলো না। তাকে কেউ মারেনি।
এ বিষয়ে কুশুরা ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সারোয়ার হোসেন বাবুকে বলেন, ছাত্রলীগ নেতা রনি ও ছাত্রদলের ছেলেদের সাথে মারামারি শুনে আমি সেখানে এগিয়ে যাই। পরে আমি তাদের সবাইকে শান্ত হতে বলি কিন্তু কেউ শুনে না। পরে শুকুর আলীদের আমি সেভ করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের ভিতরে নিয়ে যাই যেন কেউ আর মারতে না পারে। পরে জয়নুদ্দিন কাকা আসেন। ওনি উত্তেজিত হয়ে বুকে হাত দিয়ে পড়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, তিনি স্টক করার পর আমি সহ আরো অনেকেই তার মাথায় পানি দেই৷ পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মারি কাউকে মারধর করি নাই। আমি একজন জনপ্রতিনিধি হইয়ে কিভবে কাউকে মারবো।
ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। নিহতের স্বজনদের কোন অভিযো নেই। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*