প্রশাসনে এগিয়ে যাচ্ছে নারী

প্র‌তি‌দিন বাংলা‌দেশ, ডেস্ক:
রাজনীতি ও অন্যান্য খাতের মতো জনপ্রশাসনেও এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। দিন দিন বাড়ছে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা। বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষপদ সচিব ও সমপর্যায়ের দায়িত্বে রয়েছেন ১০ নারী। নিজ যোগ্যতায় মাঠ প্রশাসনের একটি বিভাগীয় কমিশনার, ৬টি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও ২০টি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (এডিসি) পদ দখলে রেখেছেন তারা। পাশাপাশি দেশের ১১৩টি উপজেলায় দাপটের সঙ্গে প্রশাসন পরিচালনা করছেন নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। এ ছাড়া সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দায়িত্বে রয়েছেন ১০৮ নারী। যারা পুরুষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন। এমন কি সবাইকে টপকে জনসেবা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসকের পদকও জিতেছেন নারী কর্মকর্তারা। তবে প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তারা প্রধানত তিনটি বাধার মুখে পড়ছেন।
এগুলো হল, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নারীবান্ধব যানবাহন সংকট এবং নিজ সন্তানের দেখভাল করতে না পারা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, বর্তমান সরকার নারীদের সামনে নিয়ে আসতে কর্মকৌশল প্রণয়ন, বাজেট বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এখন চাকরির ক্ষেত্রেও নারীরা এগিয়ে আসছেন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নারী বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন প্রশাসনের গতিও বেড়েছে। হয়ত দেখা যাবে, একটা পর্যায়ে চাকরির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান হবে।
দেশের দুই বড় দল আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদের উপনেতা সবাই নারী। এক সময় যাদের কর্মকাণ্ড ঘরে রান্নার বাইরে কল্পনাই করা যেত না, সেই নারীরা সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাবে চাকরি করছেন। বিমান পরিচালনা এবং রেলগাড়িও চালাচ্ছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসন ক্যাডার ছাড়াও সরকারি চাকরিতে নারী কর্মকর্তা কর্মচারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ২০১০ সালে সরকারি চাকরিতে নারী ছিলেন ২ লাখ ২৭ হাজার ১১৪ জন। ২০১৬ সালে ওই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ২০৬ জন। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে সরকারি চাকরিতে নারীকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ৯২ জন। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার সংখ্যা ২৭ হাজার ৪৬০ জন। দ্বিতীয় শ্রেণীর ৪০ হাজার ৬৪০, তৃতীয় শ্রেণীর পদে কর্মরত দুই লাখ ৪৫ হাজার ৮৬২ জন। এছাড়া চতুর্থ শ্রেণীর পদে কাজ করছেন ৪৮ হাজার ২৪৪ জন নারী। দেশে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা আছেন ৫ হাজার ৬৯৮ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ২৭৭ জনই নারী।
মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ ও পদায়ন শাখার তথ্যানুযায়ী, আগে নারী কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক পদগুলোতে থাকতেন। এখন ডিসি ও ইউএনওর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। বর্তমানে দেশের ১১৩ জন নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। কর্মরত ইউএনওদের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে কর্মরত রয়েছেন আরও ১০৬ জন নারী কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস উইমেন নেটওয়ার্কের মহাসচিব এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক নাসরিন আক্তার বলেন, আগের চেয়ে প্রশাসনে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ছে। এক সময় রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
বাংলাদেশের প্রথম নারী সচিব জাকিয়া আক্তার চৌধুরীর মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীর বর্তমান অবস্থান খুবই ভালো। তবে এ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। আরও এগিয়ে যেতে হবে প্রতিটি সেক্টরে। প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর কর্মবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন যারা : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৬ মার্চের হিসাব অনুযায়ী সচিব ও সমপর্যায়ের ৭৭টি পদে ১০ জন নারী রয়েছেন। অর্থাৎ মোট সচিবের ১৩ শতাংশ নারী। এরা হলেন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক সচিব নাছিমা বেগম, সরকারি কর্ম কমিশনের সচিব আখতারী মমতাজ, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য জোয়েনা আজিজ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মাফরুহা সুলতানা, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম, বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বেগম সাহিন আহমেদ চৌধুরী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব ড. নমিতা হালদার, শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব আফরোজা খান, পরিকল্পনা কমিশনের ভারপ্রাপ্ত সদস্য শামীমা নার্গিস এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক নাসরিন আক্তার। এছাড়া সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম।
পাশাপাশি ৬ জেলার প্রশাসন পরিচালনা করছেন নারীরা। এরা হলেন, উম্মে সালমা তানজিয়া (ফরিদপুর), সায়লা ফারজানা (মুন্সীগঞ্জ), কামরুন্নাহার সিদ্দিকী (সিরাজগঞ্জ), শাহীনা খাতুন (নাটোর), সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন (নরসিংদী) ও সুলতানা পারভীন (কুড়িগ্রাম)। তাদের মধ্যে ফরিদপুরের উম্মে সালমা তানজিয়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ২০১৭ সালে জনসেবার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসকের পদক পান। একই বছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসক পদকও পান তিনি।
মাঠ প্রশাসনে নারীদের বাধা প্রসঙ্গে উম্মে সালমা তানজিয়া বলেন, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও ইতিবাচক নয়। মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ পদে নারীদের মানতে নারাজ অনেকে। নারী কর্মকর্তাদের যানবাহন বড় সমস্যা। সরকারি দায়িত্ব পালনে নারী কর্মকর্তাদের যে ধরনের নিরাপদ বাহন প্রয়োজন তা নেই। পাশাপাশি নারী কর্মকর্তারা নিজ সন্তানের দেখভালে সময় দিতে পারেন না। এটা বড়ই কষ্টের। তারপরও নারীরা রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে যাবে এমন স্বপ্নই দেখেন তানজিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*